আর কত প্রাণ ঝরলে রাস্তাকে অনিরাপদ বলা যাবে?

প্রতিবছর ঈদের আগে আমরা নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাগ গোছাই, টিকিট কাটি, প্রিয়জনদের জন্য উপহার কিনি। শত ঝক্কি মাথায় নিয়ে রওনা করি বাড়ির পথে। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউ লঞ্চে। ঈদের আগ মুহূর্তে এমনকি বাদ যায় না মালবাহী ট্রাকও। দেশব্যাপী পণ্য পরিবহণে নিয়োজিত ট্রাকগুলোও সব হয়ে ওঠে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যানবাহন। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, যেভাবেই হোক, মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। যে আনন্দ, যে উচ্ছ্বাস নিয়ে বাড়ির দিকে ছোটে মানুষ, তার অনেকটাই টুটে যায় রাস্তায়। প্রতিবছরই। ঈদের পর আমরা খবরের কাগজ খুলি আর দেখি, চোখ ভরা আনন্দ আর ব্যাগ ভরা প্রিয়জনের জন্য কেনা ভালোবাসা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা করেছিল যে মানুষ, সে আর বাড়িতে পৌঁছেনি। পৌঁছেছে তার লাশ। যারা নিরাপদে গিয়ে পৌঁছেছিল, তাদের অনেকে আবার ফিরতে পারেনি। কেউ ফিরেছে অ্যাম্বুলেন্সে, কেউ ডুবে গেছে লঞ্চঘাটে পানির নিচে, কেউ চিরতরে নিশ্চুপ হয়ে গেছে হাইওয়ের ডিভাইডারে থেঁতলানো লোহার ভেতর।

ঈদের আগে বাড়ি ফেরা আমাদের জাতীয় আবেগ। ব্যাগে ব্যাগে লেগে থাকে নতুন কাপড়ের গন্ধ, চোখে ভেসে থাকে মায়ের মুখ,  কানে বাজে বাবার কণ্ঠ, মনের ভেতর উঁকি দেয় উঠোনের ধুলোর স্মৃতি। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে মানুষ অপেক্ষা করে। মনে মনে কামনা করে ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত চলে, পথ যেন ছোট হয়, যেন দ্রুত শেষ হয়। যেন উড়াল পক্ষীর মতো উড়াল মেরে গিয়ে পড়া যায় মায়ের কোলে। কিন্তু তা হয় না প্রায়ই। প্রতি ঈদেই এই পথ লম্বা হয়ে যায়, ভয়ংকর হয়ে যায়। অনেকের জন্য হয়ে যায় শেষ ঠিকানা, চিরতরে। ঘরে ফেরার পথ তাদের আর কখনো শেষ হয় না।

পদ্মায় ডুবে যাওয়া বাস

এবারের ঈদেও তাই হলো। কেউ বাড়ি পৌঁছাতেই পারলেন না। কেউ ফিরলেন না মায়ের কাছে, সন্তানের কাছে, স্ত্রীর কাছে। কেউ আবার বাড়িতে ফিরলেও আর ফিরে আসতে পারলেন না শহুরে সংসারে। ঈদের পর দিনই কাজে যোগ দেবে বলে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিল যে দোকান কর্মচারী, তার আর দোকানে ফেরা হলো না। আবার ফেরা হলো না অফিসে। ছোট্ট শিশুটির ফেরা হলো না তার বন্ধুদের কাছে, পুরনো ক্লাসে। ছুটি ফুরোনোর আগেই তারা ফিরল সংবাদে—“রাস্তায় নিহত ২০৪ জন! ফেরি ঘাটে পদ্মায় বাস ডুবে ৪০! বাস-প্রাইভেটকার সংঘর্ষে ৫! ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন! এ যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের হতাহতের হিসাব। অথচ আমরা কোনো যুদ্ধ করছি না; আমরা শুধু বাড়ি যাচ্ছিলাম, আমরা শুধু বাড়ি থেকে ফিরছিলাম কর্মক্ষেত্রে! ফিরতে ফিরতেই আমাদের মানুষগুলো সংখ্যা হয়ে যায়। সংখ্যাগুলো একের পর এক পাশাপাশি দাঁড়ায় সংবাদপত্রে। যোগফল ক্রমে বাড়তেই থাকে। কেউ ভেবে দেখে না, এই তো, কিছুক্ষণ আগেই প্রতিটি সংখ্যার ভেতরে একটি করে পৃথিবী ছিল—একটি ঘর, একটি কণ্ঠ, একটি অপেক্ষা ছিল। সংখ্যাগুলো কেবলই সংখ্যা নয়, একেকজন জলজ্যান্ত মানুষ ছিল!

তবু আমরা শুনি ঘোষণা—এবারের ঈদ যাত্রা নাকি সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে নির্বিঘ্ন ছিল। টেলিভিশনের পর্দায় সরকারের মন্ত্রীদের অবলীলার হাসিমুখ দেখি। কী অকপটে মৃত মানুষের মাথাপিছু ২৫ হাজার টাকা করে ঘোষণা করছেন মন্ত্রী মহোদয়।

কী অদ্ভুত তাদের ভাষা! মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে দেশজুড়ে ২৫০টি মৃত্যু পেরিয়ে আসা ঈদযাত্রা নিয়ে কীভাবে ‘নিরাপদ’ শব্দটি উচ্চারিত হয়? এই শব্দ উচ্চারণের আগে কি কারও মনে পড়ে না, কতজনের ঈদ এবার থেমে গেল রাস্তায়? কতজনের বাড়িতে ঈদের জন্য কেনা নতুন কাপড় বদলে গেল সাদা কাফনের কাপড়ে? কতজনের বাড়িতে কাপড়টি পড়ে আছে ঠিকই,  কিন্তু যে মানুষটি পরার কথা ছিল, সে আর নেই? ২৫০ জন মানুষ মরলে যদি রাস্তা নিরাপদ হয়, তবে অনিরাপদ কাকে বলে?

আমরা হয়তো সংখ্যায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিয়মিত মৃত্যু দেখতে দেখতে মৃত্যু আমাদের কাছে স্বাভাবিক পরিসংখ্যান হয়ে গেছে। আমার অন্তর হয়তো পাষাণ-পাথর হয়ে গেছে। আমরা হয়তো ভুলেই গেছি যে, সড়ক কখনো পরিসংখ্যান নয়। সড়ক হলো মানুষের যাত্রাপথ। এই যাত্রাপথ নিরাপদ করা আমাদেরই দায়িত্ব। মানুষের এই যাত্রাপথ যখন নিয়মিত মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়, তবে সেটিকে আর কেবল দুর্ঘটনা বলা চলে না। এটি সামনে আসে এক দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাস হয়ে। এক দীর্ঘ নির্লজ্জ নির্লিপ্ততার দলিল হয়ে।

প্রতিবারই ঈদের আগে নিয়ম করে অভিযান হয়। Bangladesh Road Transport Authority প্রতি বছরই ঈদের আগে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। কাগজে-কলমে হাজার হাজার গাড়ি ‘চেক’ হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই একই ব্রেকহীন, লাইটবিহীন, ক্ষয়ে যাওয়া টায়ার নিয়ে স্টিয়ারিং ঢিলা বাস-ট্রাকই রাস্তায় নামে। প্রশ্ন হলো—যদি গাড়িগুলো ফিট না হয়, তাহলে রাস্তায় নামল কীভাবে? আর যদি ফিট হয়, তাহলে এতগুলো দুর্ঘটনা কেন?

একে তো ফিটনেসবিহীন গাড়ি তার সাথে যোগ হয় চালকদের ক্লান্তি ও অনিয়ন্ত্রিত ড্রাইভিং। নড়বড়ে স্টিয়ারিং সিটে বসে থাকা ড্রাইভারদের দিকে তাকালে আরেকটি নির্মম সত্য চোখে পড়ে। ঈদের সময় তাদের ওপর পড়ে বাড়তি ট্রিপের চাপ। তড়িঘড়ি করে ডাবল ট্রিপ মারার চাপ, সময়ের চাপ, মালিকের চাপ। ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা, কখনো কখনো একটানা ২০ ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালানো মানুষগুলো আর চালক থাকেন না। তারা নিজেরাই তখন হয়ে ওঠেন একেকটি টাইম বোমা। চোখে ঘুম, হাতে স্টিয়ারিং, সামনে ভিড়, এলোমেলো দ্রুতগামী গাড়ি—এই সমীকরণে দুর্ঘটনা কেবল সময়ের অপেক্ষা।

দুর্ঘটনায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া প্রাইভেটকার

হাইওয়েতে বাসগুলোকে আমরা রীতিমতো রেস করতে দেখি, একে অন্যকে ওভারটেক করতে দেখি রাস্তার শৃঙ্খলার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই। একে অন্যকে ওভারটেক করার তীব্র উন্মাদনা, গতি দিয়ে সময়কে হারানোর চেষ্টা সবার মধ্যে। এই প্রতিযোগিতার পুরস্কারই হয় মৃত্যু। কে আগে যাবে, এই নিয়ে সবার তাড়া। কিন্তু সামনেই যে হা করে বসে আছে মৃত্যু, সেই হিসাব কেউ রাখে না। যেন যাত্রী নয়, ধান-গমের বস্তা বোঝাই করা হয়েছে তাদের গাড়িতে। উল্টে-পাল্টে গেলে বস্তার আর কী ক্ষতি হবে, বড়জোড় দুই চার মণ ধান-গমের ক্ষতি ছাড়া! এই সংস্কৃতি চলছে বছরের পর বছর। কেউ থামায় না। থামানোর কেউ নেই।

একই জায়গায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটে, একই মোড়ে উল্টে যায় গাড়ি। ডিভাইডার ভাঙা, ইউ-টার্ন বিশৃঙ্খল, মার্কিং মুছে গেছে, সিগন্যাল অচল, অথচ কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমরা বড় বড় সড়ক প্রকল্পের গল্প শুনি, কিন্তু সেই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের গল্প আর শুনি না।  সড়ক বানানোই যেন শেষ কাজ। নিরাপদ রাখা কোনো কাজ নয়।

সড়ক পথের মতো নদীপথেও নিরাপত্তা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ। লঞ্চের ঠোকাঠুকিতে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায় মানুষ, ফেরিতে উঠতে নামতে গিয়ে ৪০ জন মানুষসহ গভীর নদীতে ডুবে যায় বাস, কিন্তু নিরাপত্তা তদারকি চোখে পড়ে না। থাকে না কোনো জরুরি রেসপন্স টিম। থাকলেও তাদের হাতে থাকে না আধুনিক কোনো উদ্ধারকারী সরঞ্জাম। সবকিছুকেই আমরা স্রেফ দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিই। অথচ এ দুর্ঘটনার পেছনে যে আমাদের বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা অবহেলা দায়ি, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দায়ি, সে কথা স্বীকার করি না।

সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো দুর্ঘটনা বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের মুখের ভাষা। চোখের সামনে মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে আড়াই শতাধিক মানুষের মৃত্যু দেখেও যখন বলা হয় ‘সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদ যাত্রা’, তখন সেই বাক্য নিহতদের পরিবারের কাছে এক নিষ্ঠুর ঠাট্টার মতো শোনায়। মানুষের মৃত্যু নিয়ে কি অবলীলায় এমন ঠাট্ট-মশকরা করা চলে? এটা কি কোনো সভ্য সমাজের সাথে খাপ খায়? খায় না।

রাষ্ট্র যদি বিপুল পরিমাণ নাগরিকের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে এমন স্বাভাবিক হিসেবে নিতে শুরু করে, তখন সেই রাষ্ট্রের কাঠামো সভ্য কী না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।  এবং ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ, এতগুলো মানুষের মৃত্যুকে কেবল নিয়তির লেখন বলে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। যে দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটে, যে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী, তা কেবল দুর্ঘটনা নয়। তা হলো অব্যবস্থাপনা, ও চরম দায়িত্বহীনতা। আর এই অবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা সরকারের। উন্নত দেশগুলো যেখানে সড়কে মৃত্যুকে শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কাজ করছে,  আমরা সেখানে ২৫০ জন মানুষ হারিয়েও আত্মতৃপ্তির ঘোষণা দিই কী করে? স্বাভাবিক একটা সময়ে যুদ্ধকালীন সময়ের মতো শত শত প্রাণহানীর সামনে বসে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রার আত্মপ্রবঞ্চনা আর কতকাল চলবে?

আমরা এমন রাস্তা চাই না, যেখানে প্রতিটি যাত্রা নির্ভর করবে শুধু ভাগ্যের ওপর। আমরা এমন রাষ্ট্রীয় ভাষা চাই না, যেখানে মৃত্যু হাজির হবে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে, আর নিরাপত্তা শেষ হবে একটি বিবৃতিতে। আমরা দায়িত্বশীল আচরণ চাই। চলতি পথের সকল অব্যবস্থাপনার সমাধান চাই। আমাদের দাবি নিরাপদ রাস্তা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। ঈদ আনন্দের উৎসব, পারিবারিক মিলনের উৎসব, বাড়ি ও ঘরে ফেরার উৎসব। এটি কখনো মৃত্যুর উৎসব হতে পারে না। হতে দেওয়া যায় না। আমরা এ অবস্থার আশু অবসান চাই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক

অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top