তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়াল

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত একাধিক ফ্রন্টে তীব্রতর হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার অতিক্রম করে। এর আগে ১৯ মার্চ সর্বশেষ ব্রেন্টের দাম সাময়িকভাবে ১১৯ ডলার ছুঁয়েছিল।

দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা শুরু হয়, যখন ইরান জানায় তারা সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুত। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সেনারা এলে তাদের ‘আগুনে পুড়িয়ে’ দেওয়া হবে এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদেরও ‘শাস্তি’ দেওয়া হবে।

সপ্তাহান্তে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

একই সময়ে দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান আরও বাড়ায় ইসরায়েল।এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। রোববার দিবাগত রাত দেড়টা পর্যন্ত জাপানের নিক্কেই ২২৫ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৪ শতাংশের বেশি পড়ে যায়।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত হয়েছে।

এতে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটে পড়েছে বিশ্ব।যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে পড়ছে। অনেক দেশ জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল না ফিরলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি না হলে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে।

৬ এপ্রিলের সময়সীমা তিনি গত বৃহস্পতিবার আরও ১০ দিন বাড়িয়েছেন। 

একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের অবসানে ১৫ দফা প্রস্তাব দেন এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি মনে করি ইরান নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে, খুব শিগগিরই।

তবে ট্রাম্পের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। তারা পাল্টা যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ক্ষতিপূরণ এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অধিকার স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে।

অনিক্স ক্যাপিটাল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ নিউম্যান বলেন, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রকৃত প্রভাব এখনো পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ নির্দিষ্ট চক্রে হয়। ইউরোপে এর প্রভাব পুরোপুরি অনুভব করতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লেগেছে। এখন ব্রেন্টের দামে বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবং এটি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমান সরবরাহ সংকটের মাত্রা নজিরবিহীন। বাজারে এমন ঘাটতি আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রিমিয়াম সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর প্রভাব এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয়নি, তবে আগামী মাসগুলোতে তা পরিষ্কার হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কিছু জাহাজকে ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে ইরান। তবে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় এই চলাচল এখনো অনেক কম।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার শনিবার জানান, ইরান ২০টি পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে, যা তিনি “শান্তির দিকে অর্থবহ পদক্ষেপহিসেবে উল্লেখ করেন।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও জানিয়েছেন, তাদের জাহাজগুলোকে একই ধরনের অনুমতি দিয়েছে তেহরান।

মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সাতটি অ-ইরানি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা বুধবার ছিল পাঁচটি এবং মঙ্গলবার চারটি।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top