বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার কর্মদর্শন, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি এক গভীর দায়বোধে প্রসারিত হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানকে অনেকেই সামরিক নেতা, রাষ্ট্রপতি বা রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করেন কিন্তু আমার কাছে তাকে আলাদা করে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। সেটি হলো, তার পরিবেশভাবনা এবং বাস্তবমুখী উন্নয়নদর্শন।
জিয়াউর রহমানের উন্নয়নচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের প্রকৃত শক্তি তার মাটি, পানি এবং কৃষিতে। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে নির্বিচারে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরির বদলে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন জলব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়।
এই প্রেক্ষাপটে তার খাল খনন কর্মসূচি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খাল ছিল কৃষির প্রাণরসধারা।
খাল মানে কি শুধু পানি? না। খাল মানে সেচ, মাছ, নৌযান, পরিবহন এবং পুরো গ্রামীণ অর্থনীতির একটি জীবন্ত অবকাঠামো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাল ভরাট হয়ে গেলে বা অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেলে কৃষির উপর তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। জিয়াউর রহমান সেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছিলেন এবং দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই কর্মসূচি ছিল একাধারে কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি।
খাল খননের ফলে কৃষকের জমিতে সহজে সেচ পৌঁছাত, বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হতো এবং একই সঙ্গে গ্রামীণ জলজ সম্পদও বৃদ্ধি পেত।
একটি খাল একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। খালের পানিতে মাছ জন্মায়, খালের তীর ঘেঁষে গাছপালা জন্মায়, পাখি আসে, মাটির উর্বরতা বাড়ে। অর্থাৎ একটি পুরো পরিবেশগত চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমানের পরিবেশ ভাবনার আরেকটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় তার আন্তর্জাতিক সফরগুলোতেও। তিনি যখন সৌদি আরব সফরে যান, তখন সেখানকার মরুভূমির প্রেক্ষাপটে তিনি বৃক্ষরোপণের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। মরুপ্রধান ভূখণ্ডে সবুজের স্বপ্ন দেখার যে সাহস ও দূরদৃষ্টি তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়।
আজকের পৃথিবীতে উন্নয়নের নামে আমরা এমন এক দৌড়ে অংশ নিয়েছি, যেখানে কংক্রিট, ফ্লাইওভার এবং বিশাল স্থাপনা উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের জীবন, কৃষি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা কখনোই টেকসই হতে পারে না। এই জায়গাতেই জিয়াউর রহমানের চিন্তাধারা আলাদা হয়ে ওঠে। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন মানে শুধু শহর সম্প্রসারণ করলে চলবে না। একই সাথে করতে হবে, গ্রাম, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের পুনর্জাগরণ।
এই কারণেই আজ যখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির কথা শোনা যাচ্ছিলো, তখন আমি সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখি।
একটি খাল কৃষকের জন্য সেচের উৎস হতে পারে, আবার একই সঙ্গে খালের দুই পাড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল কিংবা অন্যান্য ফসল চাষের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে জমির ব্যবহার বাড়বে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং খাদ্য উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
খালকে কেন্দ্র করে একটি ক্ষুদ্র কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠবে, যেখানে পানি থাকবে, মাছ থাকবে, শাকসবজি থাকবে এবং গ্রামীণ মানুষের জীবিকা আরও বৈচিত্র্যময় হবে। একই সঙ্গে এটি জলাবদ্ধতা কমাতে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে এবং স্থানীয় পরিবেশকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করবে।
একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় কেবল তার রেখে যাওয়া চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে। জিয়াউর রহমান সেই অর্থে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নেতা নন। তিনি এমন এক উন্নয়নদর্শনের প্রতিনিধি, যেখানে প্রকৃতি, কৃষি এবং মানুষের জীবন একসাথে বিবেচিত হয়।
আজকের বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে চায়, তবে খাল, নদী, গাছ, মাটি, এই মৌলিক সম্পদগুলোর দিকে নতুন করে ফিরে তাকানোর সময় এসেছে। কারণ কংক্রিটের শহর মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার মাটি, পানি এবং সবুজের উপর।




