অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পেলেন বাংলাদেশি অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান

অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া হলো অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ সম্মাননা ব্যবস্থা, যা নাগরিকদের অসাধারণ সাফল্য ও সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়। এটি ১৯৭৫ সালে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক প্রবর্তিত হয় এবং অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর-জেনারেল এই সম্মাননা প্রদান করেন।

নিজ শহর টুউম্বা এবং কুইন্সল্যান্ড রাজ্যে বিভিন্ন দায়িত্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি, তিনি ২০১৪ সালে স্বল্প সময়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন অব ইসলামিক কাউন্সিলস (AFIC)-এর অন্তর্বর্তী কমিটির চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৩ সাল থেকে তিনি টুউম্বা অঞ্চলের প্রথম ও একমাত্র মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য তহবিল সংগ্রহে নেতৃত্ব দেন, যার তৎকালীন মূল্য ছিল ১২ লক্ষ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। ২০১৫ সালের জানুয়ারি ও এপ্রিলে মসজিদটি দু’বার অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেওয়ার পর, ২০১৫ সাল থেকে এর পুনর্নির্মাণ কার্যক্রমেও তিনি নেতৃত্ব দেন। প্রকল্পটি ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়, যার মোট ব্যয় ছিল ৩০ লক্ষ অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি।

১৭ এপ্রিল ২০১৫ সালে টুউম্বা মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর, তিনি কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী, টুউম্বা সাউথের রাজ্য সংসদ সদস্য এবং টুউম্বার মেয়রের সঙ্গে যৌথভাবে এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান। মসজিদ পোড়ানোর মাত্র দুই দিন পর, পূর্বনির্ধারিত মসজিদ ওপেন ডে অনুষ্ঠানটি ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড (UniSQ)-এর অন্য একটি ভেন্যুতে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

তাঁর নেতৃত্বে, কমিউনিটি অগ্নিসংযোগকারীকে ক্ষমা করে দেয়, তবে একই সঙ্গে ঘোষণা করে যে এ ধরনের অপকর্ম সমাজ, ব্যক্তি কিংবা শহর ও দেশের জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। তিনি স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটি ও ভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের জোরালো সমর্থনে টুউম্বা রিজিওনাল কাউন্সিলের সঙ্গে মসজিদ প্রকল্পের উন্নয়ন আবেদন (ডেভেলপমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন) নিয়ে সফলভাবে আলোচনা ও সমঝোতা করেন।

অধ্যাপক খান ২০২২ সালে ইউনিএসকিউ (UniSQ) থেকে পদত্যাগ করে ঢাকায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালে তাঁকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, টুউম্বার ইমেরিটাস অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয়। একই বছরে ইউনিএসকিউ তাঁর সম্মানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রফেসর শাহজাহান খান স্কলারশিপ চালু করে।

তিনি একজন গতিশীল নেতা এবং তরুণ ও প্রবীণ অস্ট্রেলিয়ানদের—বিশেষত নন-ইংলিশ স্পিকিং ব্যাকগ্রাউন্ড (NESB) থেকে আসা মানুষদের—জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি সম্প্রীতিপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গঠনে নিরলস ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এবং সবার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে আরও সুন্দর ও বসবাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে অবদান রাখছেন।

অধ্যাপক খান টুউম্বাকে একটি একসংস্কৃতির সমাজকে রূপান্তরিত করে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক আদর্শ মডেল শহরে পরিণত করার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। এখানে সবাই পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করে—যা অস্ট্রেলিয়ার শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির সম্ভাব্য মডেল শহর হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৩ সালে টুউম্বা আজকের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না; বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি প্রসারে তখন অনেক শক্ত প্রতিবন্ধকতা ছিল। ঐসময় ত্বকের রং, ধর্মবিশ্বাস বা চেহারার ভিন্নতার কারণে অনেকেই হামলা ও বিদ্বেষের শিকার হতেন। ইউনিএসকিউ নেতৃত্ব ও স্থানীয় কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন ও ঘনিষ্ঠ কাজ শহরটিকে সবার জন্য স্বাগতপূর্ণ এক নগরে রূপান্তরিত করেছে।

২০১৩ সাল থেকে তিনি টুউম্বায় বার্ষিক আন্তর্জাতিক খাদ্য উৎসব ও মসজিদ ওপেন ডে আয়োজন করে আসছেন, যেখানে হাজার হাজার মানুষ—কমিউনিটি নেতা, রাজনীতিবিদ, চার্চ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাসহ—অংশগ্রহণ করেন। এসব আয়োজন কমিউনিটিগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ায় এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করে। টুউম্বা মসজিদ এখন শহরের একটি সাংস্কৃতিক আইকন; এটি শিশু ও পরিবেশবান্ধব এবং টুউম্বা কার্নিভাল অব ফ্লাওয়ার্স উদযাপনের অংশ। এটি তরুণ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য নানাবিধ কার্যক্রম ও সহায়তার কেন্দ্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top