ইরানের শিশুদের পক্ষে দাঁড়াবে কে?

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার আগুনের ফুলকি। জ্বলছে ইরান। ইতিহাসের দীর্ঘ ও রক্তমাখা অধ্যায়ে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে শিশুদের কান্না। গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেনের পর এ তালিকায় এবার স্পষ্ট ও ভারী হয়ে উঠছে ইরানের নাম। আমেরিকা-ইসরায়েলের চলমান আক্রমণ,  ইরানের পাল্টা আক্রমণ, সীমান্তজুড়ে ক্ষেপনাস্ত্র, মিসাইল, বোমার বিস্ফোরণ, উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক বিবৃতি আর সামরিক ঘোষণার ভেতর সবচেয়ে নিঃশব্দ যে আর্তনাদ, তা আসছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা শিশুদের কাছ থেকে। ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে আমেরিকান হামলায় এরইমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ১৪৮ শিশু! এসব শিশুর প্রাণহানীর খবর কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি অসমাপ্ত গল্প, একটি খাতা-খোলা স্কুলব্যাগ, একটি ছোট্ট টিফিনবাটি, একটি কার্টুন আঁকা পানির বোতল, একটি অর্ধেক আঁকা সূর্য! সকালবেলা হাসিখুশি মুখে ঘর থেকে বেরিয়েছিল যে শিশুরা, তার আর কখনোই ফিরবে না ঘরে!

প্রশ্নটা রাজনৈতিক নয়, নিতান্তই নৈতিক জায়গা থেকে জানতে চাওয়া আমার, এই যে প্রায় দেড় শতাধিক শিশু সকাল বেলা স্কুলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরার সুযোগ পেল না, এর জন্য দায়ী কে? কাকে আমরা দোষি করব? ইরানের শিশুদের পক্ষে দাঁড়াবেই বা কে?

এটা জানা কথা যে, যুদ্ধের ভাষা বরাবরই কঠিন, শুষ্ক, কৌশলী ও চরম রূক্ষ্ম। সেখানে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু, প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব, প্রতিশোধ এই জাতীয় শব্দগুলো ঘুরে বেড়ায় রাষ্ট্র প্রধানদের মুখে। কিন্তু শিশুরা এসব শব্দ বোঝে না। তারা বোঝে মায়ের হাত, স্কুলের মাঠ, রঙিন পেনসিল। তারা বোঝে বৃষ্টির পর কাদায় পা ডুবিয়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফেরা। তারা সম্রাজ্য বোঝে না, ভূরাজনীতি বোঝে না, আগ্রাসন বোঝে না, পারমাণবিক চুক্তির ব্যর্থতা বোঝে না। তাদের কোনো কূটনৈতিক অবস্থান নেই। অথচ প্রতিটি বিস্ফোরণের অভিঘাত প্রথমে গিয়ে লাগে তাদের বুকেই। তারাই প্রথম ঝরে পড়ে!

একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণহানি নয়, এটি একটি ভবিষ্যতের মৃত্যু। হয়তো সে বড় হয়ে কবি হতো, হয়তো বিজ্ঞানী, হয়তো কৃষক, হয়তো শিক্ষক। হয়তো সে নিজেই একদিন যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলত, অনেক হয়েছে তোমাদের, এবার থামো। কিন্তু সেই সুযোগ তারা আর পায় না। ধ্বংসস্তূপ তাদের সব সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দেয় নিদারুণভাবে।

বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকারের প্রশ্নে নানা সময় নানা কথা বলা হলেও বিশ্ব বিবেক যে এ ব্যাপারে আন্তরিক নয়, এ কথা স্পষ্টতই বলা যায়। শিশুদের অধিকার, শিশু সুরক্ষা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এসব শব্দ বারবার উচ্চারিত হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা দেখা যায় না। রাজনীতি প্রায় সময়ই নৈতিকতার কণ্ঠরোধ করে। শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রগুলো গর্বিত হয় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। এমনকি  সুরক্ষার চেষ্টাটুকুও করে না। হামলার সময় কে শিশু, কে বৃদ্ধ, কে নারী কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না। জাতিসংঘের সভাকক্ষে যুদ্ধবিরোধী বক্তৃতা হয় ঠিকই, কিন্তু বোমা থামে না। শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গঠনের যে প্রতিশ্রুতি জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিকসংস্থা ঘোষণা করে, এসব মনে হয় জাস্ট আই ওয়াশ। কাগজে-কলমে থাকলেও, বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটা রাষ্ট্র শিশুদের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশ্নটা কেবল রাষ্ট্রের দিকে ছুঁড়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নাগরিক সমাজ, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষক আমাদের প্রত্যেকের দায় এবং দায়িত্ব আছে এ ব্যাপারে। আমাদেরকে অবশ্যই শিশুদের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। আওয়াজ তুলতে হবে শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রশ্নে। যখন কোনো একটি দেশের শিশুরা আগুনের ভেতর দিয়ে বড় হতে বাধ্য হয়, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তের শিশুর নিরাপত্তাও আসলে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। কারণ যুদ্ধ সংক্রামক। এক দেশ থেকে শুরু হয়ে অন্য দেশে সে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। আজ যদি আমরা বলি—‘ওটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়’, কাল হয়তো একই বাক্য আমাদের জন্যও কেউ উচ্চারণ করবে। আজ ওদের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, কাল হবে আমাদের শিশুরা।

শিশুদেরকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। এটা কেবল আবেগ নয়, এটাই হওয়া উচিত সভ্যতার মৌলিক নীতি। রাষ্ট্রের মর্যাদা, সীমান্তের অখণ্ডতা, প্রতিরোধের অধিকার সবকিছুর উপরে থাকতে হবে শিশুর জীবনরক্ষা। যুদ্ধ যদি অবশ্যম্ভাবীও হয় (যদিও তা কখনোই সত্যিকারের অবশ্যম্ভাবী নয়) তবু শিশুদের সুরক্ষা হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শিশুদের স্কুল, কলেজসহ হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র এগুলোকে নিরপেক্ষ অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। কোনো পক্ষই এসব স্থাপনার ওপর আক্রমণ করতে পারবে না। শিশুর প্রাণহানী হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে অবশ্যই এর সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব নিতে হবে। কোনো অযুহাতেই শিশুদের জীবননাশ চলবে না। ইসরায়েল আমেরিকাকে অবশ্যই শিশুদের প্রাণহানীর দায় নিতে হবে।

আমার আপনার শিশুর মতোই পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর চোখে পৃথিবী এখনো বিস্ময়ের। তারা জানে না ইতিহাসের দীর্ঘ দ্বন্দ্ব, জানে না ধর্মীয়-রাজনৈতিক জটিলতা, জানে না কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ, তেলবাণিজ্য বা সম্রাজ্যের দৌরাত্ম। তাদের কাছে পৃথিবী মানে একটি ছোট উঠান, একটি আকাশ, একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে আমাদের সমস্ত উন্নয়ন, প্রযুক্তি, কূটনীতি সবই ব্যর্থ।

ইরানের শিশুরা আজ কেবল ইরানের নয়। তারা গোটা পৃথিবীর জন্যই একটা পরীক্ষা। আমরা কি শক্তির রাজনীতির পাশে দাঁড়াবো, নাকি নিষ্পাপ জীবনের পক্ষ নেব? আমরা কি বুলেটের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাব, নাকি প্রতিটি শিশুমৃত্যুর বিরুদ্ধে হৃদয়ের ভেতর জাগাবো বিদ্রোহ?

আমাদেরকে অবশ্যই কথা বলতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার পক্ষে কলম ধরতে হবে। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রতিবাদ চলমান যুদ্ধে বিরতি টানতে পারে। আমাদের সম্মিলিত আওয়াজে আসতে পারে শিশুদের জন্য নিরাপদ দেশ গড়ার বৈশ্বিক অঙ্গীকার। আসতে পারে এমন এক পৃথিবী, যেখানে কোনো শিশুকে আর বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙতে হবে না। আমি সারা পৃথিবীর সব দেশের, সব জাতির, সব ভাষার লেখক-কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদেরকে আহ্বান জানাই, আসুন, আমরা শিশুদের পক্ষে দাঁড়াই। শিশুদের কোনো ধর্ম-বর্ণ নেই, শিশুদের কোনো দেশ নেই। পৃথিবীর সব শিশুরাই আমাদের। আমাদেরকে অবশ্যই শিশুদের নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top