বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা কি আদালত নির্ধারণ করবে, নাকি জনগণ নিজেরাই?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে “রাজনৈতিক প্রশ্ন” বলে একটি ধারণা আছে। যেখানে বলা হয়েছে, কিছু প্রশ্ন আদালতের বিচারযোগ্য নয়। কারণ সেগুলো মূলত রাজনৈতিক, নীতিগত বা সার্বভৌম জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। যেমন, Baker v. Carr মামলায় আদালত নিজেই নির্ধারণের চেষ্টা করে কোন বিষয় বিচারযোগ্য, কোনটি নয়। সেখানে আদালত স্বীকার করে, সব প্রশ্ন আদালতের জন্য নয়। কারণ আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যাকার হতে পারে কিন্তু জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিকল্প নয়।
“গণঅভ্যুত্থান নিজেই বৈধতা”। এর জন্য আদালাতের স্বীকৃতির দরকার নেই। ইতিহাসে এমন নজির আমরা বহুবার দেখেছি। ফ্রেঞ্চ রেভুলিউশনের পর নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠতে পুরোনো রাজকীয় আদালতের অনুমোদনে দরকার পড়েনি। নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল জনতার শক্তিতে। একইভাবে রাশান রেভুলিশনও পুরোনো সাম্রাজ্যিক কাঠামো ভেঙে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মুহূর্তে বৈধতার উৎস বদলে যায়। বৈধতার উৎস সিংহাসন বা আদালত থেকে সরে এসে জনগণের হাতে ন্যস্ত হয়।
আমাদের নিজেদের ইতিহাসও কিন্তু তাই বলে। স্বাধীনতা যু*দ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণা পাকিস্তানি আদালতের অনুমোদনে হয়নি। হয়েছিল জনগণের র*ক্ত, প্রতিরোধের মাধ্যমে। এবং সেই মুহূর্তে পুরোনো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা কার্যত ভেঙে পড়ে। নতুন ধারাবাহিকতা তৈরি হয় সংগ্রামের ভিতের ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে, যদি “জুলাই জাতীয় সনদ”এর ভিত্তি গণঅভ্যুত্থান হয়, তবে তার বৈধতা কি আদালত বাতিল করতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে আদালত সংবিধানের রক্ষক। কিন্তু যদি সংবিধান নিজেই গণঅভ্যুত্থানের ফলে পুনর্লিখিত বা পুনর্ব্যাখ্যাত হতে থাকে, তবে আদালতের অবস্থান কোথায়? আদালত তখন কি পুরোনো ধারাবাহিকতার প্রতিনিধি, নাকি নতুন বাস্তবতার সাথে অভিযোজিত একটি প্রতিষ্ঠান?

যদি সনদকে অবৈধ বলা হয়, তবে একই ধারায় নির্বাচনসহ পরবর্তী সব আইনি-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কারণ এগুলো একই বাস্তবতার ভেতর থেকে উদ্ভূত। ৫ই আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিকে যদি অসাংবিধানিক বলা হয়, তবে তার ভেতরকার সব সিদ্ধান্ত, জোট, নির্বাচন, সবই সেই অভিযোগের আওতায় পড়ে। তখন কেবল সনদ বাতিল করে ক্ষান্ত দেওয়া যাবে না। বাতিল হয়ে যাবে পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
এখানে “সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা” বনাম “বিপ্লবী বৈধতা”র দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হিসেবে দেখছে কেউ কেউ। তাদের মতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বলে রাষ্ট্রের স্থিতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নিয়মের ধারাবাহিকতা জরুরি।
সেখানে আমাদের মত হলো, বিপ্লবী বৈধতা বলে, যখন সেই নিয়ম জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তখন জনগণই চূড়ান্ত বিচারক।
এবং মনে করি, রাজনৈতিক তত্ত্বে এই দ্বন্দ্বের কোনো একক সমাধান নেই। কারণ প্রতিটি দেশের বাস্তবতা, শক্তির ভারসাম্য এবং সামাজিক ঐকমত্য নির্ধারণ করে কোন পথে ইতিহাস এগোবে। এবং বাংলাদেশের জনগণ রায় দিয়েছে, দেশ গণঅভ্যুত্থানের ভিতের উপর ভিত্তি করে এগোবে।
যারা “সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা” বনাম “বিপ্লবী বৈধতা”র দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এনে দেশে একটি ক্যাওয়াটিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বলবো, গণআকাঙ্ক্ষা যদি সত্যিই বিস্তৃত ও সুস্পষ্ট হয়, তবে আদালত সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে অস্বীকার করতে পারে না। আদালত রায় দিতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারে না।
কারণ রাষ্ট্র কেবল সংবিধানের ধারায় টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে জনগণের জাগরণে, জনগণের আস্থায়। যে মুহূর্তে জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দাঁড় করায়, সেই মুহূর্তে বৈধতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। এবং তখন আদালতসহ সব প্রতিষ্ঠানকে নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। জনগণের রায় মেনে নিতে হয়। নয়তো পতিত হতে হয়, আবর্জনার আস্তাকুঁড়ে।
(লেখাটি লেখক ও এ্যাক্টিভিস্ট আল-আমিন সরলের ফেইসবুক থেকে নেওয়া।)




