“সংঘাতের চেয়ে শক্তিশালী সংলাপ,
ঘৃণার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সহমর্মিতা।
চলো, আমরা রক্তের বদলে রোপণ করি বীজ,
অবিশ্বাসের বদলে আস্থা,আর অন্ধকারের বদলে আনি দীপ্ত সকাল।
সংঘাত নয়—শান্তির হোক আমাদের ভবিষ্যত।
এই শপথে জেগে উঠুক নতুন ভোর,
এই প্রত্যয়ে উজ্জ্বল হোক আমাদের বাংলাদেশ।”
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে এক দীর্ঘ উত্তেজনা, সংশয় ও প্রত্যাশার আবহের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে যে, এদেশের মানুষ চলমান রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন চায়। জনগণ এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তারা সংঘাত নয়, স্থিতি চায়। প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে চায় প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধিপত্যের পরিবর্তে চায় কার্যকর গণতান্ত্রিক ভারসাম্য।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি ফলাফল নয়, বরং এক মনস্তাত্ত্বিক বাঁকবদল। বহু বছর ধরে মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও অবিশ্বাস এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক নতুন সমীকরণে প্রবেশ করেছে। রাজপথের সংঘাত, সামাজিক মাধ্যমে তর্ক, রাজনৈতিক জোট-ভাঙাগড়া সব মিলিয়ে দেশ যেন এক দীর্ঘ উত্তেজনার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে এখন দাঁড়িয়ে আছে এক সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে। এ সম্ভাবনাকে ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারলে নতুন এক বাংলাদেশের দেখা মিলবে।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতি কার্যত প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদি কায়দার শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি চরম দমন-পীড়ন ও ভিন্নমতের প্রতি অতি বৈরী মনোভাবের কারণে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর আমলে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে সংসদে কার্যকর বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল ভীষণভাবে। সংসদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক তোষামদি আর অহেতুক বাগাড়ম্বরের সরকারি বিনোদন কেন্দ্র। যেখানে আইন পাস হয়েছে, বাজেট অনুমোদিত হয়েছে কিন্তু মানুষ সেটাকে কখনো নিজের ভাবতে পারেনি। একরৈখিক সংসদ যেন বিতর্কের চেয়ে আনুষ্ঠানিকতার মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য যেখানে মতের যৌক্তিক লড়াইয়ে, সেখানে বিরোধী মতের অনুপস্থিতি তৈরি করেছিল নিদারুণ স্থবিরতা।
এই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনে বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। দীর্ঘ সময় নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করে, প্রান্তিক অবস্থানে থাকার পর জামায়াতে ইসলামী দলটি সংগঠন পুনর্গঠন, সামাজিক কাজ ও তৃণমূল যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটে দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ, জুলাইয়ের অগ্রনায়কদেরকে জোটে টানার সুফল পেয়েছে তারা। তাদের এই পুনরুত্থান একদিকে সমর্থকদের কাছে যেমন আদর্শিক প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে রাজনৈতিক বাস্তবতার ফসল—দুই দৃষ্টিভঙ্গিই রয়েছে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তারা এখন সংসদীয় সমীকরণের একটি দৃশ্যমান অংশ। আগামী সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
একইসঙ্গে এবারের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া দল এনসিপির তরুণ ছাত্রনেতাদের ৬ জন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরাসরি সংসদে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন। এটা প্রতীকী ও বাস্তব দুই অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। ক্যাম্পাস-ভিত্তিক রাজনীতি যে জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, মানুষ যে তরুণদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, তার প্রমাণ মিলেছে। এই প্রজন্ম স্লোগানের চেয়ে নীতি, আবেগের চেয়ে জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেয়—এমন প্রত্যাশা জনগণের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে। তবে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্দোলনের ভাষা থেকে সংসদের ভাষা ভিন্ন। প্রতিবাদ আর প্রস্তাবনার ফারাক অনেক। এই দুয়ের সমন্বয় করে জনপ্রত্যাশার স্তরে উত্তরণ—এটাই হবে তাদের প্রকৃত পরীক্ষা।

নির্বাচন সংঘাতবিহীন সম্পন্ন হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়টা কাটছে বেশ উত্তাপের ভেতর দিয়ে। বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত, প্রতিহিংসামূলক হামলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই উত্তাপ উত্তেজনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে আমাদের গণতন্ত্র এখনো সহনশীলতার পূর্ণ চর্চায় পৌঁছাতে পারেনি। বিজয়ের উল্লাস কখনো কখনো প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাহীনতায় রূপ নিয়েছে, আবার পরাজয়ের বেদনা কোথাও কোথাও প্রতিরোধে বিস্ফোরিত হয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা না গেলে গণতন্ত্র কেবল কাঠামোগত থাকবে, প্রাতিষ্ঠানিক হবে না।
তবে আশাবাদের জায়গাও তৈরি হয়েছে। বিজয়ী দলের প্রধান জনাব তারেক রহমান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম-এর বাসায় গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ ধরনের সাক্ষাতের ঘটনা রীতিমতো নজিরবিহীন। এ সাক্ষাৎ নিছক কোনো সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; এটা ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট একটা রাজনৈতিক বার্তাও বটে। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও দূরত্ব পেরিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল যদি একে অপরের প্রতি আন্তরিক হয়, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক নজির হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব কমাতে সহায়ক হয়েছে। এই ধারাটা যদি টিকে থাকে, তবে বিরোধীতা থাকবে, কিন্তু বৈরিতা কমবে। দেশের প্রশ্নে সবাই এক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অতীত আমাদের শিখিয়েছে সংসদ যত অকার্যকর হয়, রাজপথ তত উত্তপ্ত হয়। রাজপথ উত্তপ্ত হলে রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর হয়। আর রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর হলে গণতান্ত্রিক আস্থা ক্ষয়ে যায়। তাই নতুন সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বিতর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। জামায়াতের মতাদর্শিক অবস্থান, এনসিপির তরুণ উদ্যম, বড় দলগুলোর অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে যদি সংসদকে কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করা যায়, তবে সেটাই হবে প্রকৃত পরিবর্তন।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে? সেটা নির্ভর করছে তিনটা বিষয়ের ওপর। প্রথমত, রাজনৈতিক সহাবস্থান, অর্থাৎ ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখার প্রবণতা ত্যাগ করা। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ—যারা কেবল ভোটার নয়, নীতি-নির্ধারণের সক্রিয় অংশীদার হতে চায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি বহু ঝড় দেখেছে। কিন্তু প্রতিটা ঝড়ের পরই একটি নতুন সকাল এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই সকালের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। অতীতের দূরাবস্থা আমাদের সতর্ক করুক, বর্তমানের বিশ্লেষণ আমাদের বাস্তববাদী করুক, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমাদের উদার করুক।
নতুন বাংলাদেশের যাত্রা তাই সংঘাতের না হয়ে সংলাপের হোক। প্রতিশোধের না হয়ে, পুনর্মিলনের হোক। একক আধিপত্যের না হয়ে হোক অংশীদারিত্বের। গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সকল পক্ষ নিজ নিজ শক্তি নিয়ে একই সংসদে বসে দেশের জন্য কথা বলে। সেই দিনটিই হোক আমাদের রাজনীতির নতুন সূচনা।
“আমরা দেখেছি আগুনের ভাষা,
দেখেছি প্রতিহিংসার বিষ।
তবু প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের ভেতর
একটি সবুজ অঙ্কুর মাথা তোলে—সে বলে, “ভালোবাসাই আমাদের সম্বল।”
লেখক: কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ




